| Star Diary |
|
|
|
তারকার ডায়েরি
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ইমপ্রেস
টেলিফিল্ম প্রযোজিত বাংলা ছায়াছবি আহা! ছবিটি নির্মাণ করেছেন স্থপতি এনামুল করিম
নির্ঝর। ছবিটি নির্মাণের বিভিন্ন বিষয় ও তাঁর চলচিত্র ভাবনা নিয়ে তিনি লিখেছেন
তারকার ডায়েরি বিভাগে। উল্লেখ্য, আহা ছবির প্রিন্ট মিডিয়া পার্টনার
পাহ্মিক আনন্দ আলো...
‘মানুষের
মনই তার সেন্সর বোর্ড
-এনামুল করিম নির্ঝর
মুহূর্তের মধ্যে সবার সঙ্গে মিশে গেলেন
ফজলুর রহমান বাবু। এলাকার ছোট-বড় অনেকের পছন্দের তারকাও তিনি। আগে থেকেই তার
সম্পর্কে আমার পজিটিভ ধারণা ছিল। কিন্তু বাবু ভাই যে
একজন ট্যালেন্ট এবং শক্তিমান অভিনেতা সেটা তিনি তার কাজ দিয়ে সবাইকে বোঝাতে
পেরেছেন। আহা ছবির স্যুটিং হয়েছে ঢাকার হাজারীবাগের একটি ঐতিহাসিক পুরনো বাড়িতে।
বাবু ভাইয়ের চরিত্র হলো সেই বাড়ির কেয়ারটেকারের। যেহেতু তিনি কেয়ারটেকার এবং তার
একটি পূ্ররব ইতিহাস আছে তাই বাড়ির আশপাশের মানুষের সঙ্গেও একধরনের ভাব জমাতে হবে।
ছবি গল্পে স্যুটিংয়ের প্রথম দিনেই দেখা গেল হাফপ্যান্ট পরে সারাবাড়ি ঘুরে
বেড়াচ্ছেন তিনি। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করছেন। শুধু বাবু ভাই-ই নয়, আহা ছবিতে
যারা কাজ করছেন তারা প্রত্যেকেই একাত্ম হয়ে
গিয়েছিলেন কাজের সঙ্গে। অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে ইউনিটের টেকনিশিয়ান,
ক্যামেরাম্যান, প্রোডাকশনের লোকজন এমন কি একজন টি-বয় পর্যন্ত সবাই কাজের ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন। আমি
বিশ্বাস করি যেকোনো একটি ভালো কাজের সুন্দরভাবে শেষ করার জন্য
পরো টিমকে ক্রেডিট দেয়া উচিত। আহা ছবিটিও একটি কমপ্লিট টিমওয়ার্ক এর সফল
বাস্তবায়ন। তবে ছবিটিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী মনোনয়নের ব্যাপারে আমাকে অনেক বেগ পেতে
হয়েছে। তাই স্যুটংয়ের আগে যাদের নিয়ে চিন্তা
করেছি তাদের অনেককে নিয়ে কাজ করতে পারিনি। বর্তমান সময়ের অনেক নামীদামি
স্টারের কাছে গিয়েছি। তারা অভিনয় করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। যেমন এই বয়সে তারা
মায়ের ভূমিকায় (নায়িকার চরিত্র) অভিনয় করতে পারবেন না। তাদের ধারণা মায়ের ভূমিকায়
অভিনয় করলে হয়তো তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে। আমার ধারণা বিশ্ব চলচ্চিত্র সম্পর্কে
তাদের ধারণা অল্প। একদিন খোঁজ পেলাম একসময়ের মিস বাংলাদেশের সাথী ইসলামকে। বাংলার
মেলার স্বত্বাধিকারী এমদাদ হকের মাধ্যমে প্রথমে খোঁজ পাই সাথীর। বাসায় গেলাম
সাথীকে দেখতে। দেখি তার চুল লাল। তবে চেহারার মধ্যে একধরনের আড়ষ্টতা আর মায়াবী ভাব
আছে। কথা বলে জানতে পারলাম তার মধ্যে একধরনের কষ্টও আছে। ওর স্টিল
ছবি তুলে মেকআপ দিয়ে ফটোশপে দেখলাম। মনে হলো ওকে দিয়ে হবে। তাকে বললাম কালই চুল
কালো করবেন। স্ক্রিপ্ট পড়ে রাজি হয়ে গেল সাথী। মল্লিক সাহেব অর্থাৎ বাড়িওয়ালার
চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমার প্রথম পছন্দ ছিল আলী যাকেরকে। কিন্তু অতিরিক্ত গরম
এবং রোদে তার শারীরিক সমস্যা হতে পারে ভেবে তিনি অভিনয়
করতে রাজি হননি। পরে সেই চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন শ্রদ্ধেয় তারিক আনাম খান।
আমার বলতে দ্বিধা নেই কিসলু চরিত্রে ফরীদি ভাইকে কাস্ট করার সময় অনেকে বলেছেন তিনি
সেটে অনেক ঝামেলা করবেন। আমার কষ্ট হবে ইত্যাদি।
অবাক ব্যাপার হলো কাজ শুরু হওয়ার পর উনি হলেন আমার প্রিয় এক বড় ভাই। সকাল
থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সেটে থাকতেও তার আপত্তি ছিল না। লাবণী আপাকে (প্রজ্ঞা
লাবণী) দিয়ে অভিনয় করানো আরেক মজার ঘটনা। আমাদের স্যুটিং চলা অবস্থায় লাবণী আপাকে
কল করা হয়। কেননা ঠিক ওই চরিত্রটিতে আরেকজন অভিনয়
করেছিলেন।আমি এই মুহূর্তে তার নাম বলব না। একদিন শুনি ইউনিটের একজনের সঙ্গে তিনি
খারাপ ব্যবহার করেছেন। এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে আমি সিদ্ধান্ত নেই তাকে নিয়ে আমি
কাজ করব না। কী করা এখন কাকে নেই? আবার এমদাদ ভাই। তিনিই প্রজ্ঞা লাবণীর ব্যাপারে
আমাদের বলেন। লাবণী আপাকে সেটে ডাকা হলো। তিনি এলেন। কছু
বুঝে ওঠার আগেই তার প্রথম শট ওকে হলো। অবশ্য একজন মানুষের নাম এখন পর্যন্ত বলাই
হয়নি। তিনি শহীদুল আলম সাচ্চু। যিনি আমার ছবির শুরু এবং শেষ পর্যন্ত অনেক কাজের
সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আমার
সঙ্গে তার। আর যে মানুষটি আমাকে ওয়েল উইশার মনে করে বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছেন
তিনি হলেন আজকের চলচ্চিত্র স্টার ফেরদৌস। আহা ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে তিনি আসিফ
চরিত্র অভিনয় করেছেন। এর বাইরে কাজী রকিব, মাসুদা কাজী এবং আমার সহকারী রিয়েল এর
নাম না বললেই নয়। মূল স্যুটিং শুরু হওয়ার আগে আমরা প্রায় পনের দিন রিহার্সেল
করিয়েছি সবাইকে। কেননা তার নিজের চরিত্রের
মধ্যে ঢুকে যেতে পারবেন। তাই হলো কারো কোনো ওজর-আপত্তি ছিল না। সবাই আসেন
রিহার্সেল। ফরীদি ভাই, বাবু ভাই, সাচ্চু ভাই, তারিক ভাই সবাই। কয়েকদিন রিহার্সেলর
পর তাদের চরিত্রানুযায়ী কস্টিউম পরানো হলো। মেকআপ যার যার চরিত্র
অনুযায়ী নাম ধরে ডাকা হতো। যেমন, রুবা, মল্লিক স্যার, কিসলু...।
দেখলাম আমার এই কেমিস্ট্রি খুব কাজে
এলো। তারিক ভাই যেহেতু বাড়ির কর্তা তাই তিনি সবার সঙ্গে বাবার মতো করে কথা বলা
শুরু করলেন। তার মধ্যে খুব ধীর-স্থির একটা ভাব। আবার অন্যরা সবাই
তার চরিত্রানুযায়ী কথা বলা শুরু করলেন। শুধু তাই নয়,
ছবিতে যে বাচ্চাটি সাথীর ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সে এখনও সাথীকে ‘মাম’
বলে ডাকে। স্যুটিং শুরু হওয়ার পর আমার ঘোষণা ছিল, প্রতিদিন সবাই যার যার কস্টিউম
পরে মেকআপ নিয়ে বসবেন। এতে কারো স্যুটিং থাকুক বা নাই
থাকুক। তাই হয়েছে। একটি বড় রুমে আমরা আড্ডার জোর বানিয়েছিলাম। সেই রুমে এসি বসিয়ে
সুন্দর করে সাজিয়েছিলাম। তখন আমরা সবাই বেশ উপভোগ করতাম স্যুটিংয়ের
বাইরের সময়টুকু। তারিক ভাই সারাহ্মণই লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে থাকতেন।
স্যুটিং-এর গল্প
শুরু করার আগে একটু পেছনে যেতে চাই। একসময় খুব এলোমেলো চিন্তা করতাম আমি। তবে যাই
করতাম না কেন সবসময় সৃজনশীল চিন্তা মাথার মধ্যে ঘোরপাক খেত। ৯২-তে বুয়েট থেকে
স্থাপত্যবিদ্যার সার্টিফিকেট নিয়ে ভাবলাম কী করব!
ডিজাইন করব নাকি ছবি বানাব। আবার ভাবলাম
ছবি বানাতে তো অনেক টাকার প্রয়োজন। তাহলে আগে
ডিজাইন করি তারপর ছবি। এর মধ্যে বনানীর হোয়াইট ক্যাসল, বুখারা, সন্তুর,
অ্যাসপারাগাস রেস্টুরেন্ট ডিজাইন করলাম। খুব কম সময়ে পরিচিতি
এলো। সেই শুরু। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক নামীদামি মানুষের বাড়ি
করেছি আমি। তখন থেকে স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছি। এসব কাজের
পাশাপাশি বিনোদন হিসেবে স্টিল ছবি তুলতাম এবং ভিডিওগ্রাফি করতাম। একদিন খুব ভোর
ছবি তোলার জন্য হাজারীবাগ এলাকায় গেলাম। কাকতালীয়ভাবে মিলে গেল আমার লেখা ছবির
স্ক্রিপ্টের সেই বাড়িটি। আমার কল্পনা এবং লেখার মধ্যে যা যা ছিল সবই আছে
হাজারীবাগের সেই বাড়িটিতে। পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির পাশে দহ্মিণের
রাস্তা। কৃষ্ণচূড়া গাছ, খোলা জায়গা, সামনে ছোট ঘর ইত্যাদি। খোঁ নিয়ে জানলাম মানিক
বাবু নামে এক হিন্দু ভদ্রলোক বাড়িটির মালিক ছিলেন। ৪৭-এর দেশভাগের সময় মানিক বাবুর
পরে জনৈক আশরাফ সাহেব বাড়িটির মালিক হন। কাছে গিয়ে না
দেখলে সেই বাড়ি সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। বাড়ির নিচে বেজমেন্ট ছিল। ফাঁসির জায়গা
ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি আপনাদের কাছে এ গল্প যখন লিখছি তখন সেই বাড়িটির অস্তিত্ব
বিলীন হয়ে গেছে। অর্থাৎ বাড়িটি সত্যি সত্যি ভেঙে ফেলে
সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট বানানো হচ্ছে। যাই হোক যাদিন সকালবেলা বাড়িটি দেখি সেদিনই
আমি যোগাযোগ করি বাড়িওয়ালার সঙ্গে। প্রথমে সব শুনে স্যুটিং করতে দেবেন না বলে
জানান। অনেকভাবে তাকে বোঝানো হলো। এক পর্যায়ে রাজি করানো গেল আশরাফ সাহেবকে। তবে
শর্ত তিন মাসের বেশি সময় দেবেন না।
২৫ এপ্রিল ২০০৫ ভোর ৫টায় কল। মজার
ব্যাপার হলো এর আগে অনেক ভিডিও ফিল্ম নির্মাণ করলেও জীবনে কখনো মুভি ক্যামেরায় কাজ
করিনি। লুক থ্রো করিনি। স্যুটিং দেখার সামান্য অভিজ্ঞতার কথা। আমি তখন নায়িকা
খুঁজছি আহা ছবির জন্য। আবু সায়ীদের নিরন্তর ছবিতে তখন
অভিনয় করছেন শাবনূর। তার সঙ্গে কথা বলার জন্য একদিন আমি গিয়েছিলাম সেই স্যুটিং
স্পটে। আহা!’র
স্যুটিং শুরু হলো। কিন্তু আমি অ্যাকশন বলছি না। তারিক ভাই বলছেন, তুমি অ্যাকশন বলছ
না কেন? আমি বললাম করেন না। সেকি কথা। একসময় অ্যাকশন বলি। রোলিং চলে কিন্তু কাট
বলা হয় না। আবার তারিক ভাই বললেন, আরো ব্যাটা তোমার তো সব ফিল্ম
শেষ হয়ে যাবে। ক্যামেরাম্যান বাদল ভাই ডাকেন। আমার লজ্জা লাগে অ্যাকশন আর কাট
বলতে। সেদিনই দুপুরের পর থেকে বিষয়টি আমার গ্রিপের মধ্যে চলে আসে। আস্তে আস্তে
বুঝতে থাকি ক্যামেরার ভাষা।
আমাদের নিয়ম ছিল ছবির
প্রত্যেকটি শট নেয়ার আগে ভিডিও মনিটর মাস্ট। আবার শটগুলো স্টিল করে ফ্রেমে দেখে
নেয়া। কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো একটি হাতি হলে মন্দ হতো না। আর একটি বৃষ্টির শট
নেয়া দরকার।আমার ছবির প্রধান সহকারী রিয়েলকে মনের কথাগুলো বললাম। মিরাকল হলেও
সত্যি যে, স্যুটিং শুরুর দুই দিনের মাথায় দেখি সেখান দিয়ে বিশাল এক হাতি যাচ্ছে।
সার্কাসের হাতি। আরো অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেদিনই বৃষ্টি হলো। এর সবকিছু ক্যামেরায়
ধারন করা হলো। আসলে আমরা চেয়েছিলাম ছবির প্রতিটি দৃশ্যই যেন বাস্তব হয়। যেমন
সাচ্চু ভাইয়ের চেহারা কালো করার জন্য ইংল্যান্ড থেকে মেকআপ সামগ্রী আনা হয়েছে।
আবার বিদেশ ফেরত রুবা অর্থাৎ সাথী ক্লান্তি নিয়ে
বাপের বাড়িতে ঢুকবে। সেই দৃশ্যটি ধারণ করার জন্য তাকে দোতলা পর্যন্ত বিশবার
সিঁড়িতে ওঠা-নামা করানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো ছবিতে এমন কিছু দৃশ্যের শট আছে
যেগুলো আসল শট নয়। কেননা অনেক সময় দেখা গেছে ‘অ্যাকশন’
বলার সঙ্গে সঙ্গে পারফরমাররা একটু বেশি সতর্ক হয়ে যান। যার ফলে দৃশ্যটি ধারণ করা
কঠিন হয়ে গেছে। তাই ক্যামেরাম্যানকে বলা ছিল অ্যাকশন বলার আগেই আপনি রেকর্ড শুরু
করে দেবেন ইশারা পেলেই। ভয়ঙ্কর তথ্য হলো আমার ছবির টোট্যাল ফুটেজ ছিল ১১ ঘন্টা।
বলতে পারেন আমার অনভিজ্ঞতার কারণেও সেটি হতে পারে। তবে আমি বলি
অনভিজ্ঞতাই আমার অভিজ্ঞতা। আমি আসলে শিহ্মিত মধ্যবিত্ত দর্শকদের জন্য বানিয়েছি আহা
ছবিটি। ছবিটি রিলিজ দেয়ার আগে আমি প্রি-টেস্ট করিয়েছিলাম বিভিন্ন পেশার মানুষদেরকে
দিয়ে। একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক থেকে শুরু ড্রাইভার ছিল সেই তালিকায়। তাদের
কমেন্টও নিয়েছি। কেননা আমি মনে করি যারা ছবির আসল দর্শক
তারাই যদি গ্রহন না করে তাদের কিসের জন্য আমরা ছবি বানাব। সবকিছু বিবেচনা করে আমার
ছবি সাড়ে ৩ ঘন্টা সময়সীমা থেকে কমিয়ে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটে এনেছি। আমি আমার ছবি
নির্মাণের আগে আমার আশপাশের বিভিন্ন দেশের ছবি
দেখেছি। সেই দেশের কে, কী ধরনের কাজ, কোথায় করেন সেগুলো জেনেছি। কেননা আমরা তো
উন্নত দেশের ছবি দেখে শুরুতেই অনেক কিছু শিখতে পারব না। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা
সবাই আগে হলিউডের ছবি দেখি, যেই ছবির গল্প আমাদের জীবনের সঙ্গে একদমই মিল নেই।
আমরা বড়জোর আমাদের দেশের পর কলকাতার ছবি নিয়ে আলোচনা করতে পারি। কেননা সেটি আমাদের
ভাষার ছবি। আমি মনে এই সময়ে করি আমাদের ছবির গল্পে নাগরিক জীবনের গল্পকে বেশি
প্রাধন্য দেয়া উচিত। আহা রিলিজ হওয়ার পর ভালো-মন্দ সব ধরনের কমেন্টস পেয়েছি।
প্রবাসী বাঙালিরা অনেক এসএমএস করেছে। কেউ কেউ
ফোন করে কথা বলেছে। অনেকের কাছে মনে হয়েছে রুবা চরিত্রটি যেন তার নিজের জীবনেরই
প্রতিচ্ছবি। অনেকে জানতে চেয়েছে কিসলু কি সত্যিই মারা গিয়েছিল? কেউ কেউ মনে করেছেন
কিসলুর মারা যাওয়া উচিত নয়। আবার অনেকে জানতে চেয়েছেন, ছবিটির প্রথমদিকে বাড়ি এবং
বাড়ির মানুষের জীবনযাপন, কষ্টকে হাইলাইট করা হয়েছে কিন্তু ছবির শেষের দিকে রুবা আর
কিসলুর অংশটাই বেশি দেখানো হয়েছে। কেন? এই প্রশ্নের উওর অনেক রকম হতে পারে। একজন
আর্কিটেক্ট হিসেবে আমি বাড়ি বানাই। তখন দেখা যায় প্রথমে বাড়িকে হাইলাইট করি এবং
আস্তে আস্তে বাড়িটির সঙ্গে বাড়ির সবাইকে ইনভলব করি। ঠিক একইভাবে আহা ছবির শেষের
দিকে বাড়ির মানুষের জীবনযাপনকে হাইলাইট করা হয়েছে। আমি মনে করি লাইফে
সেলিব্রেশনটাই জরুরি। হলে গিয়ে ছবি দেখে তাহলে সেই ছবি নির্মাণ করে কী লাভ। আমাদের
দেশের কোনো কোনো নির্মাতা আছেন যারা শুধুমাত্র অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার জন্য ছবি নির্মাণ
করে আমি তার ঘোরবিরোধী।আমার ছবিটিও এই পর্যন্ত দেশের বাইরে
চারটি চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনয়ন পেয়েছে। তার মানে কি আমার ছবিতে কোনো মেসেজ নেই?
আমরা ছবির গল্পের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই।
একটি ঘটনার কথা বলি। জার্মানির মিউনিখে
ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গেলাম। এশিয়ান নাইট। প্রচুর দর্শক, ডাকা হলো। হি ইজ এন
আর্কিটেক্ট। নাউ ট্রাই টুবি এ ফিল্ম মেকার। দেন হি ইজ ডিরেক্টর ফ্রম দ্য পুয়োরেস্ট
কান্ট্রি বাংলাদেশ। আমার মন খারাপ এবং কিংবর্তব্যবিমূঢ়। মাইক ধরে
প্রথমে জোরে ফুঁ দেই যায়ে দর্শকের নজরে আসি।
বললাম- ‘আমাদের
দেশ সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণা নেই। স্বাধীনতার জন্য আমার দেশের ৩০ লাখ মানুষ
প্রাণ দিয়েছে। আমরা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করেছি। আমরা বিশ্বযুদ্ধ লাগানোর
জন্য যুদ্ধ করিনি’।
কিছুহ্মণ নিরবতা তারপর হাততালি।
আহা! আমার চলচ্চিত্রে প্রথম পাঠ।
ভুল আছে, অর্জনও আছে। খুব যত্ন নিয়ে শব্দ আর মিউজিকের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু
আমাদের দেশের সিনেমা হলের সাউন্ড সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কারণে সেভাবে দর্শকরা
দর্শকরা পুরো স্বাদ হয়তো পাবেন না। আশা করি আমার প্রথম ছবিতে যে ভুলগুলো ধরা
পড়েছে, পরের ছবিগুলোতে তা কাটিয়ে উঠবে। আমার পরের ছবিটি হবে স্যাটায়ারধর্মী।
স্যাটায়ারের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কষ্টগুলোকে
সমাধানের পথ দেখানো হবে। ছবির নাম ‘বুদ্ধিবালিশ’।
আর তৃতীয় ছবি হবে পুরোপুরি নাচে- গানে সমৃদ্ধ।
মনে পড়ে ছেলেবেলায় আমার বাবাকে প্রশ্ন
করেছিলাম, সেক্স মানে কী? প্রশ্নর উওরটি সুন্দরভাবে
বুঝিয়েছিলেন বাবা। আমাদের বড় সমস্যা হলো আমরা তাকাই, দেখি, ভোগ করি কিন্তু স্বীকার
করতে লজ্জা পাই। আহা ছবিটি বেশ কয়েক মাস আটকে রেখেছিল সেন্সর বোর্ড। দু’একটি
দৃশ্যকে তারা বাদ দিতে বলেন। আমরা মেনে নিয়েছি। কেননা আমি আগেই বলেছি ছবি বানিয়েছি
দর্শকদের জন্য। আমার চিন্তার সঙ্গে বেশিরভাগ দর্শকের চিন্তা এক নাও হতে পারে। আবার
অনেকে জানতে চেয়েছেন ফরীদি কেন মেয়েদের অন্তর্বাসের
দিকে তাকিয়ে থাকেন? আমি আসলে অন্তর্বাসকে মানুষের মনের রঙকে বুঝিয়েছি। আমার মতে,
প্রতিটি মানুষের দুইটি জিনিস জরুরি।
এক. কমসেন্স
ডেভলপ করা,
দুই. ডাউন টু আর্থ হওয়া মানে বিনয়ী
হওয়া। যে পারবে না সে কখনোই পারবে না আর যিনি পারেন তিনি সবই পারবেন। আসল কথা হলো
মানুষের নিজের মনই হলো তার সেন্সর বোর্ড। বিশেষত সৃজনশীল মানুষেরা যদি খোলামানে বা
সৎভাবে চিন্তা করতে না পারে, পৃথিবী কখনো সুন্দর হবে না।
আগামী তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। Add as favourites (37) | Quote this article on your site | Views: 176
Write Comment
|
||||||
| < Prev | Next > |
|---|





