| Razza And Sohel Rana |
|
|
|
আড্ডায় বসেছিলেন তিনজন। বিষয় মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র । একদিন
নায়করাজ রাজ্জাক। অন্যদিকে নায়ক- প্রযোজক সোহেল রানা। মাঝখানে উপস্থাপকের ভূমিকায়
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর। আড্ডা শুরু হল মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাভিত্তিক
চলচ্চিত্র নির্মান প্রসঙ্গে। তারপর এক সময় উঠে আসল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত্যের
কথা,......
ফরিদুর রেজা সাগর- সোহেল রানা আপনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ
নিয়েলেন। আপনার কাছে থেকে এ ব্যাপারে কিছু জানতেচাই।
সোহেল রানা- আমি তখন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের
ছাত্র। ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলাম। সেই সঙ্গে মুলত দুই খন্ডের অর্থাৎ
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানে দুরকম অর্থনৈ্তিক আমাদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যলয়ে ভর্তি হবার পর বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৬দফায় বাঙ্গালী মুক্তির পথে খুজে
পায়।
১৯৬৯সালে শুরু হলো ১১
দফা আন্দোলন। সেই ধারাবাহিকতা থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঘরে বসে
থাকতে পারলাম না মুক্তিযুদ্ধে যাবার সিধান্ত নিলাম । আমি তখন ইকবাল হলে থাকতাম ।
২৫ মার্চে যখন হল থেকে ফিরে যাচ্ছি , তখন আমার এক বন্ধু জাফর ইকবালকে দেখি গাট্টি
বোচকা নিয়ে হলে ফিরছে। সে গ্রামে গিয়েছিল । তাকে বললাম করি তুই এই গোলমালের মধ্যে
হলে ফিরলি ? শুনতে পাচ্ছি যুদ্ধ শুরু হবে । তোরা যুদ্ধ করবি আর আমি গ্রামের বাড়িতে
বসে হাওয়া খাব। আমিও যুদ্ধ করব। আমি তার কথা শুনে হাসতে হাসতে হল থেকে বেরিয়ে
পড়লাম, আর সে হলে ঢুকল। আমি যুদ্ধে অংশ নিলাম ঠিকই কিন্তু জাফর ইকবালের আর যুদ্ধে
যাওয়া হল না কারন ২৫ মার্চ গভীর রাতে যে হত্যাযঞ্জ চালানো হলো , তাতে ইকবাল হলের
প্রথম শহীদ ছিল জাফর আলম। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পরে ইকবাল হলের বধ্যভূমিতে
তার লাশ শনাক্ত করা হয় মাথার খুলি দেখে।
ফরিদুর রেজা সাগর- একরকম লক্ষ প্রানের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা
পেয়েছি......
সোহেল রানা- কিন্তু যারা রক্ত দিল তারা কি পেল ?
তাদের কতটুকু মর্যাদা দিতে পেরেছি আমরা? যারা স্বাধীনতার জন্য
নীরবে জীবন দিল তাদের কথা আমরা কেউ বলছি না । কই জাফর আলমদের কথা তো কেউ বলে না
ইকবাল হলে যারা ২৫ মার্চে রাতে জীবন দিল তাদের উদ্দেশ্য
আজও পর্যন্ত কোন স্মৃতিসৌধ নির্মান হয়নি ।
ফরিদুর রহমান সাগর- পুরো বাংলাদেশ তো ইকবাল হল হয়ে গিয়েছিল ।
হাজার হাজার বধ্যভুমি পাওয়া গেছে আমাদের স্বাধীন দেশে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব
স্বাধীনতার কথা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা
সোহেল রানা আমরা কেউ সেই দায়িত্ব পালন করিনি । আজ যারা
মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলছেন
তাদের যদি প্রশ্ন করি গত ৩৬ বছরে কি করছেন? আজ হঠাৎ কেন স্টেজে দাঁড়িয়ে বলছেন
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে । ?
ফরিদুর রেজা সাগর - কিন্তু আমরা তো পেছনের দিকে ফিরে যেতে পারব
না । কোথাও না কোথাও থেকে আমাদের শুরু করতে হবে ।
নায়করাজ রাজ্জাকের মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই
রাজ্জাক- প্রতক্ষ ভাব না পারলেও পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার
যুদ্ধেআমি জড়িত ছিলাল। আন্দলনের তো সেই ১৯৬৯ থেকে শুরু হয় সেটাই ১৯৭১ সালে
মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয়। জহির রাইহানের সাথে থেকেই জীবন থেকে নেওয়া ছবির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া শুরু করি
। এই ছবির জন্য জহির রায়হান এবং আমাকে ক্যান্টমেন্টে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল
। ১৯৭১ এর ৭ মার্চ এফডিসির স্যুটিং ফ্লোরে বসে আমরা কাজ বন্ধ করে রেডিওতে
বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনছি। প্রত্যেকের চোখে
মুখে ছিল সংগ্রামী প্রতিচ্ছবি । সেই ভাষনে অনুপ্রানিত হয়ে আমার গুলসানের বাসায় আমি
স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম । ২৫ মার্চের কালরাত্তিরে প্রচন্ড গোলাগুলির
আওয়াজ শুনে ভেবেছিলাম হয়ত বাংলাদেশের ছেলেরা আর্মিদের আক্রমম করেছে । দেশ বোধহয়
স্বাধীন হয়ে গেছে । কিছু সময়ের জন্য কারফিউ তুলে হলে আমি বাসার
বাইরে আসি । ফার্মগেট যাওয়া পথে যে হত্যাযজ্ঞ দেখি সেই দৃশ্য আমি কোনদিনও ভুলতে
পারব না কারফিউ ব্রেক যাওয়ার সময় জহির রায়হান জানালেন, পরদিন সকালে আমাকে জানালেন
আপনার গুলসানের বাসায় থাকা ঠিক হবে না । তিনি আমাকে পুরান
ঢাকায় কায়েৎটুলির বাড়িতে যান । রাত ১০ টার দিকে জহির জানালেন সকালে
কলকাতায় চলে যাবেন। আমিও যেতে চাইলাম । তিনি আমাকে নিষেধ করলেন এবং থাকতে।
শহীদুল্লাহ কায়সার তখন আত্বগোপন রয়েছে ধানমন্ডির এক বাড়িতে । জহির রাহয়ান তখন
যাওয়ার আগে বলে গেলেন, আকাশবানী থেকে যদি কোন আনাউন্সমেন্ট আসে তাহলে আপনি
গুলসানের বাড়িতে চলে যাবেন। সতের দিন পরে আকাশবানী থেকে আমার নাম ঘোষনা করা হল ।
ভোর পাচটায় আমি বাড়িতে চলে এলাম । সকাল সাতটায় সময় আমার বাড়ি পাকিস্থানি আর্মিরা এসে ঘিরে ফেলল।
আমার নাকি আগরতলার সাথে যোগাযোগ আছে। এই অভিযোগে আমাকে
এরেস্ট করে আর্মিরা তেজগাও বর্তমান প্রাইম মিনিস্টারের সেক্রেটারিয়েট ভবনে নিয়ে
এলো। আর্মিদের টর্চারিং সেল ছিল তখন ওটা। এমন একটা সময় ছিল তখন যে কাউকে আর্মি ধরে
নিয়ে গেলে সে আর ফিরে আসে না। সুতরাং স্ত্রী আর সন্তানরা ধরে নিল আমি আর ফিরব না ।
সেলে নিয়ে বেশ কয়েকজন অফিসাররা আমাকে জিজ্ঞেস করল । তাদের কেউ হয়ত আমার ছবি
দেখেছিল বলেই কিছুটা সদয় হলো। পাচটার সময় ফিরে দেখি। আমার স্ত্রী ও সন্তানদের
যেখানটায় রেখে আমি গাড়িতে ঊঠেছিলাম তারা সেখানেই নির্বাক হয়ে বসে আছে । এই দৃশ্য আমি জীবনে ভুলব না ।
ফরিদুর রেজা সাগর- স্বাধীনতার পর প্রথম যে
চলচ্চিত্র নির্মান করা হয়েছিল, তার নাম ওরা এগারজন। চাষী নজরুল ইসলাম ছবিটি
পরিচালনা করেন। প্রযোজক ছিলেন সোহেল রানা ওরফে মাসুদ পারভেজ। ছবিটিতে অভিনয়
করেছিলেন রাজ্জাক। সোহেল রানার কাছে এ ব্যাপারে কিছু জানতে চাই।
সোহেল রানা- মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রথম আমরা
ইকবাল হলে যাই এবং সতীর্থদের
হত্যাকান্ডের নানা চিহ্ন দেখে প্রচন্ড বেদনা নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসি । সে সময় ঐ
হলের বুড়ো দারোয়ান আমাকে দেখে বলল, স্যার দেশটাতো স্বাধীন হল আপনারও ফিরে এলেন ।
কিন্তু সব সারতো আর ফিরে আসবে না। এই কথায় আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিল দেশ
তো যুদ্ধ করে স্বাধীন করলাম , কিন্তু আমরা যারা একসাথে যুদ্ধ করলাম । যুদ্ধ শেষে
তারাও ফিরে এসেছে কিন্তু সেই দলটি আগের মত নেই । দলের কেউ কেউ ফিরে এসেছে হাত - পা
হারিয়ে পঙ্গু হয়ে। আবার কেউ কেউ ফিরে আসতে পারিনি যুদ্ধে মারা গেছে । এইটুকু ছিল
আমার গল্প। আমি চাষী নজরুল ইসলামকে শুনিয়ে বললাম এটা নিয়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মান
করতে চাই। আল মাসুদ আমার গল্পটি নিয়ে চিত্রনাট্য দাড় করালেন । ওরা এগার জন ছবিটির
আসল উদ্দেশ্য ছিল যে, যুদ্ধকালীন অবস্থায় আপনজন হারানোর বেদনায় তুলে ধরা ।
ফরিদুর রেজা সাগর - রাজ্জাক ও সোহেক রানা
আপনারার দুজনেই পরবর্বতীতে অনেক ছবি প্রযোজনা করেছেন এবং পরিচালনা করেছেন।
আপনাদের বিভিন্ন ছবিতে আমরা দেশের মানুষ ও দেশের কথা পেয়েছি । কিন্তু মুক্তিদযুদ্ধ
ছবি তৈ্রীর করার উদ্যেগ কেউ নেননি কেন?
সোহেল রানা- ঐযে বললাম চারপাশে তোড়া
হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে বিকৃ্ত ছবি বানানোর চেয়ে না বানানোই ভালো। একবার পেছনে
ফিরে দেশের পরিস্থিতির দিকে চোখ রাখুন। নয় মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার মাত্র
তিন বছর পর যিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন তাকে সপরিবারে হত্যা করে ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু উপাধি ব্যবহারে ওপর বাধানিষেধ আরোপ করে হলো।
এই অবস্থায় কি ভাবে ছবি বানাবো?
রাজ্জাক - আমি যতদুর জানি পারভেজ সাহেব মুক্তিযুদ্ধের ছবি
বানানোর স্বপ্ননিয়ে প্রযোজনায় আসেন । ওরা এগারজন ছবি বানানোর পর আমার জানা মতে তার
আরো মুক্তিযুদ্ধের ছবি বানানোর কথা ছিল কিন্তু পরিস্থিতিই তাকে
তা বাস্থাবায়ন করতে দেয়নি।
ওরা এগারজন ছবির সাফল্যের পর
স্বাধীনতার কিছু বাস্তব চিত্র নিয়ে ছবি বানানোর ইচ্চা আমার ছিল । কিন্তু
দেশ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাকে এই ভাবনা বাস্থবায়ন থেকে বিরত রাখে।
সোহেল রানা - স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ছবি যদি ওরা এগার জন হয়ে
থাকে তাহলে সেই ছবিটি প্রউডিসার হিসেবে মাসুদ পারভেজ কে সরকারী ভাবে ধন্যবাদ
জানিয়ে একটা পত্রও দেয়া হল না কেন? সরকারের কাছ থেকে আমার কাজের স্বীকৃ্তি কেন
পেলাম না ?
ফরিদুর রেজা সাগর- সরকারী স্বকৃ্তী নাইবা পেলেন আপনি তো দেশের
মানুষের স্বকৃ্তী পেয়েছেন । স্বাধীনতার পর প্রথম ছবি ওরা এগারজন এর
প্রয়োজক ছিলেন বলেই আজকের আলোচনায় আমরা আপনাকে আমন্ত্রন জানিয়েছি।
সোহেল রানা - তবু মনের ভেতর একটা ক্ষোভ থেকে যায় বাহাত্তর
পরর্বতী তিন বছর ছাড়া পরবর্তী তেত্রিশ বছর সরকার আমাদের ইন্ডাজট্রিজ লোকজোনের সাথে বিমাতার মত ব্যবহার করেছে
।
ফরিদুর রেজা সাগর- চলচ্চিত্র জগৎটা আপনাদের নিজেদের হাতে গড়া ।
এই জগৎ নিয়ে আপনাদের মধ্যে গত ৩৬ ধরে যদি এত ক্ষোভ জমা হয়ে থাকে তাহলে এজন্য
আপনাদেও কি কিছু দায়ী করা যায় না ?
রাজ্জাক- নাহ, এজন্য চলচ্চিত্র শিল্পীদের দোষ দেয়া যায় না ।
বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বলছি বাংলাদেশ পঞ্চাচ দশক থেকে চলচ্চিত্র
শুরু । এফডিসি গড়ে উঠার পর চলচ্চিত্র ইন্ডাজট্রির মর্যাদা দেওয়া হয় চলচ্চিত্র
মানুষরা সমাজের সন্মানিত মানুষ হিসেবে সন্মান পান। কিন্তু সে মর্যাদা আজ কি আছে ?
আইনগত ভাবেই চলচ্চিত্র স্বাধীনতা আগে থেকেই শিল্প স্বীকৃ্তি পায়। যেকোন শিল্পকে
সরকার থেকে যেসব সার্পোট দেয়ার কথা সেটা তো পাচ্ছে না চলচ্চিত্রশিল্প। ফিল্মে
বিনিয়োগের জন্য কোন শিল্প এগিয়ে আসেনি । জতীয় পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে শিল্পীদের
উৎসাহিত করার রেওয়াজ আছে । কিন্তু আগে যেমন জাকজমকভাবে প্রদান করা হতো,
রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার তুলে দিতেন শিল্পীর হাতে । আর গত কয়েক
বছরের চিত্রটা দেখেন।এক, নিয়মিত এই পুরস্কারটা প্রদান করা হয় না । দুই, অনুষ্টানটি
করা হয় খুব দায়সারাভাবে। তিন, বড়জোরে একজন সচিব পর্যায়ে উপস্থিত থেকে শিল্পিদের
পুরস্কার দিচ্ছেন। চার, পুরস্কার মুল্যমানও আপগ্রেদ করা হয়নি। অর্থাৎ আমাদের
অবস্থান দিন দিন খাটো করে দেখা হচ্ছে।
চ্যানেল আই তৃ্তীয় মাত্রায় এই আড্ডায় চলচ্চিত্র নিয়ে আরও অনেক
কথা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা
কথা তোলেন রাজ্জাক ও সোহেল রানা । Add as favourites (75) | Quote this article on your site | Views: 390
Write Comment
|
||||||
| < Prev | Next > |
|---|





