| K-Kraft |
|
|
|
কে-ক্রেফট
তারুণ্যের দুরন্ত সাহস
১৯৯৩ সালের ১২ মে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র
সায়েন্স ল্যাবরেটরির পাশের একটি বাসায় ভিড় করেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। এ দিন
এখানে আয়োজন করা হয় হাউস শো নামের ছোট্ট আকারের পোশাক
প্রদশর্নীর। আয়োজক এই পরিবারের বড় সন্তান খালিদ মাহমুদ মাহমুদ খানের
নবপরিণীতা স্ত্রী শাহনাজ খান। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের আগমনের বাসার সামনের
চত্বর ভরে উঠে। প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয় ২৫/৩০টি পোশাক। দেখতে এসে অনেকেই
পছন্দ করে কিনে নেন পোশাকগুলো। কেউ কেউ নতুন পোশাক
তৈরির জন্য তাগিদ দেন। আর এই তাগিদ থেকে শুরু হয় নতুন ভাবনা। নতুন
করে পথচলা শুরু করেন এ নবদম্পতি। আজকের দেশের অন্যতম ফ্যাশন হাউস কে-ক্রেফটের
প্রথম দিককার ঘটনা এটি। দেশের সফল ফ্যাশন হাউস কে-ক্রেফট শুধু দেশেই নয় বিদেশের
মাটিতেও সুনাম কুড়িয়েছে। দিনে দিনে কে-ক্রেফট হয়ে উঠেছে
ফ্যাশনপ্রেমী মানুষের পছন্দের পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান। আজকের ফ্যাশন হাউসের অন্যতম
উদ্যোক্তা খালিদ মাহমুদ খান ও কে-ক্রেফট একে অন্যের পরিপূরক। একজনকে বাদ দিয়ে
অন্যজনকে এককভাবে চিন্তা করা যায় না। ‘৯৩ সালে
শুরু হওয়া পারিবারিক সেই হাউস শো থেকে যাত্রা শুরু করে আজকে
কে-ক্রেফট হয়ে উঠেছে দেশের সেরা ফ্যাশন হাউসগুলোর
অন্যতম। তিনজন মানুষ নিয়ে যাত্রা শুরু করছেন কয়েক হাজার মানুষ। কর্মকর্তা-কর্মচারী
মিলিয়েই এখন কে-ক্রেফটের স্টাফের সংখ্যা দুই শতাধিক। বলা বাহুল্য, এ সাফল্যের
পেছনে যে মানুষটি নিরলসভাবে কাজ করে চলছেন তিনি খালিদ
মাহমুদ খান। দেশে ফ্যাশনপ্রেমী মানুষের কাছে একটি পরিচিত নাম।
খালিদ মাহমুদ খানের ডাক নাম খালিদ। জন্ম
১৯৬৮ সালের ২৩ জুন ঢাকার মিরপুর রোডের পৈত্রিক বাড়িতে। বাবা মরহুম হাসান মাহমুদ
খান ছিলেন সরকারি চাকুরে। মা খালেদা খান আর এক ভাই
শাম্মী খানকে নিয়েই তাদের ছোট সংসার।
খালিদ মাহমুদ খানের শৈশবের পুরোটাই
কেটেছে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায়। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি
স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণী পযর্ন্ত পড়ালেখা করে ভর্তি হন পাবনা ক্যাডেট কলেজে। ওখান
থেকে এসএসসি পাসের পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৮৭ সালে ঢাকা কলেজ
থেকে এইচএসসি পাসের পর সিটি কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। এরপর পরিবারের সম্মতিতে
আমেরিকায় পাড়ি জমান। আমেরিকা উইনোনাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ১৯৯১-৯২ সালে ভর্তি হন
মার্কেটিং-এ। ওখান থেকে ৪০ ক্রেডিট শেষ করে পারিবারিক কারণে দেশে ফিরে আসেন। এ সময়
বাবার মৃত্যু, সম্পত্তির উওরাধিকার নিয়ে নানা ঝামেলায় আর আমেরিকায় ফিরে যাওয়া
হয়নি। ফলে দেশেই আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন। একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধীনে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স শেষ করেন ১৯৯৫ সালে।
ঢাকায় ফেরার পর ১৯৯২ সালে শাহনাজ খানকে
জীবনসঙ্গী রুপে বেছে নেন। আজকে কে-ক্রেফটের প্রথম উদ্যোক্তাও হলেন শাহনাজ খান।
বলতে পারেন শাহনাজ খানের হাত ধরেই কে-ক্রেফটের যাত্রা শুরু, আমি সহযোগী মাত্রা-
হাসতে হাসতে বলছিলেন খালিদ মাহমুদ খান।
কে-ক্রেফটের নামকরণ সম্পর্কে জানতে
চাইলে খালিদ বললেন, আমি যখন আমেরিকায়
থাকতাম এ সময় একটি রেডিও চ্যানেল খুবই জনপ্রিয় ছিল। কে-রক নামের সেই অনুষ্ঠানের
নামটা এ সময় আমার মাথার ঘুরতে থাকে। আমরা বিভিন্নজন মিলে এসময় ৫টি নাম নির্বাচন
করি। আমাদের পরিবারের খান এবং স্ত্রী শাহনাজ খানের নামের সাথে মিলিয়ে ‘কে
শব্দটি যোগ করি। এরপর ক্র্যাফট শব্দটির সাথে মিলিয়ে নামকরণ করি
কে-ক্রেফট। এতে শাহনাজ খানও সায় দেন। নিজের পণ্য ও ব্র্যান্ডকে পরিচিত করতে
ব্যানার ও পোস্টারে কে-ক্রেফট লোগো করে প্রচার করতে থাকি। একসময় এটিই ব্র্যান্ড
হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।
শুরুতে কে-ক্রেফটের মূলধন কত ছিল জানতে
চাইলে হেসে খালিদ বলেন, অনেক। আমাদের সাহস, সততার
সাথে পুঁজি ছিল নগদ ৫,০০০টাকা। বর্তমান প্রেহ্মাপটে এটি কিছুই না তবে আমাদের কাছে
ওই সময়ে এটি ছিল অনেক বড়। নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় শোরুম, নিজেদের কাজ নিজেরা করার
মাধ্যমে তখন পুঁজিটাই বেশি মুখ্য ছিল না। মুখ্য ছিল ভালো কাজ করার
উদগ্র বাসনা। আজ এই কাজের মাধ্যমেই কে-ক্রেফট অর্জন করেছে ক্রেতাদের অবস্থা। এটিই
এখন আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।
ডিজাইন, ফ্যাশন আর কাপড়ের বৈচিত্র্য
নিয়ে খালিদ মাহমুদের অনেক ভাবনা। পাশাপাশি দেশের তাঁতি ও তাঁতশিল্প রহ্মা ও বিকাশে
নিয়েছেন নানামুখী উদ্যোগ। তাঁতমেলা,
তাঁতিমেলাসহ নানা ধরনের প্রদর্শনীর সফল আয়োজকও কে-ক্রেফট। একদিকে তাঁতশিল্পকে
রহ্মা অন্যদিকে বিকাশ এই দুইয়ের সমন্বিত উদ্যোগ বারবার
কে-ক্রেফটের নাম চলে আসে।
কে-ক্রেফটের পোশাকের বৈশিষ্ঠ্য সম্পর্কে
জানতে চাইলে খালিদ বললেন-কাপড়, রঙ আর ডিজাইন নির্বাচনে ক্রেতার সন্তুষ্টি
অর্জনই থাকে আমাদের লহ্ম্য। এ জন্য প্রতিটি পোশাক তৈরির পূর্বে আমরা পোশাকটির
গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নিজেরাই আলোচনা করি। পরে প্রোডাকশনে যাই। এছাড়া নতুন নতুন
ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনতে আমাদের ডিজাইনার গ্রুপ সারা বছরই কাজ করে থাকে। এর ফলে কোন
ধরনের পোশাক ক্রেতার পছন্দ সে সম্পর্কে ডাটা তৈরি করে
কাজ শুরু করি। ক্রেতার চাওয়া-পাওয়ার ওপরে গুরুত্ব দেয়ার ফলে কে-ক্রেফটের প্রতিটি
পণ্য হয়ে ওঠে অন্যরকম।
জীবনে চলার প্রতিটি মুহূর্তে খালিদ
স্মরণ করেন প্রয়াত বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী ও ফ্যাশন ডিজাইনার চন্দ্র শেখর
সাহার নাম। বললেন এই দুইজন গুণী মানুষের সান্নিধ্য কে-ক্রেফটকে
আজকের অবস্থানে অনতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও সহধর্মিণী শাহনাজ খানের
সার্বহ্মণিক সহযোগিতাই কে-ক্রেফটকে এতদূ্র টেনে এনেছে। পাশাপাশি পেয়েছি এদেশের
তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত অসংখ্য মানুষের অকুন্ঠ সহযোগিতা। যা আমাদের পথকে করেছে
মসৃণ। খালিদ মাহমুদ ভবিষ্যতে এ দেশের তাঁত ও তাঁতশিল্পের বিকাশে কাজ করে যেতে চান।
স্বপ্ন দেখেন ভালো কিছু করার। আর এই ভালো কিছু করার
পজিটিভ চিন্তা নিয়েই এগিয়ে যেতে চান তিনি। খালিদের এই এগিয়ে চলা অব্যাহত থাকুক
প্রত্যাশা আমাদেরও। Add as favourites (136) | Quote this article on your site | Views: 834
Write Comment
|
||||||
| < Prev | Next > |
|---|





