|
Page 1 of 3
তনিয়া আহমেদের অভিনেত্রী হয়ে উঠা
ডায়মন্ড ব্রান্ড নারকেল তেলের বিঞ্জাপনে মডেলিং দিয়ে মিডিয়াতে আমার যাত্রা
শুরু। খ্যাতিমান অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেনের হাত ধরে সেই যাত্রা
শুরু হয় ১৯৯১ সালে। কাজটি করার আগে আফজাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমি
বলেছিলাম আমার চুল তো ছোট, আমাকে দিয়ে কী হবে? তখন আফজাল ভাই বলেছিলেন
আপনাকে এ নিয়ে টেনশন করতে হবে না। কাজটি আমরা ভালো মতোই করবো। যাই হোক,
কাজটি করলাম। প্রচার হতে লাগলো। প্রচার হওয়ার পর স্বাভাবাবিকভাবেই একটি
নতুন মুখ দেথতে পেল এবং আমার মনে হয় দর্শকরা আমার প্রথম বিঞ্জহপর বেশ ভারো
ভাবেই নিল। যা আমি হয়তো ওভাবে ভাবিনি তাই হলো। অর্থ্যা মডেলিং আমাকে দিয়ে
হবে এমন ভাবনা কাজটি করার আগে ছিল না। কিন্তু কাজটি কারার পর আত্মবিশ্বাস
বেড়ে যায়। এক ধরনের আগ্রহ ও ভালোলাগাবোধ তৈরি হয়। তবে কাজটি করার পর
সেভাবে ক্লিক করলো তা বলবো না। কিন্তু মানুষ জানল একটি নতুন মেয়ে এসেছে
এবং মানুষজন বলতে লাগলো মাধুরীর মতো দেখতে একটি মেয়ে এসেছে মিডিয়াতে। ওই
কমেন্ট শুনে খারাপ লাগত না। মনে পড়ে, প্রথম বিঞ্জাপনটি করার পর আফজাল ভাই
আমার কাজ খুব পছন্দ করলেন। একটি কথা না বললেই নয়-বুলু ভাইয়ের ক্যামেরায়
তখন কাজ করা বিশাল ব্যাপার এবং ফার্স্ট টেকেই ওকে হওয়াও বড় ভাগ্যের
ব্যাপার ছিল। কাজটি হওয়ার পর বুলু ভাই বলতে লাগলেন আমাদের নতুন মেয়েটিকে
দেখেন, কেমন সুন্দর করেছে ও। এই যে আমার প্রতি আফজাল ভাই ও বুলু ভাইয়ের
কনফিডেন্স এটা কিন্তু আমাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পরবর্তীতে
আমি আমিন জুয়েলার্স, আ্যারোমেটিক শ্যাম্পুর মডেল হই। এভাবে কাজ করতে করতে
দুই বছর চলে যায়। তখন কিন্তু চ্যানেল ছিল না। এত মডেলও ছিল না। আমাকে
বেইজড করেও কিছু কাজ করা হয়েছিল। এরপর অর্থ্যা ১৯৯২ সালের শেষের দিকে আজাদ
বলপেনের বিঞ্জাপন করি। এটি মাইলফলকের মতো। টার্ণিং পয়েন্ট তো অবশ্যই। এখন
পর্যন্ত যখনই বিঞ্জাপনের কখা বলা হয় তখনই আজাদ বলপেনের কথা এসে যায়। আমিন জুয়েলার্স করার পর এক ধরনের কমেন্টস পাই। আবার আজাদ বলপেন করার পর আরেক ধরনের। দেশের বাইরে থেকেও প্রশংসা পেতে থাকি। একটা বিষয় বলে রাখি, আগে তো ওরকম ফটোশেসন হতো না। এখন যেমন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নরম্যালি ঘরে ছবি তোলাই ছিল। আমার ছোট ভাই রানার বন্ধু তিথী। তিখী আফজাল ভাই এর কিছু কাজ করেছিল। একদিন তিথী আমাকে দেখার পর বলল, তুমি কি মডেলিং করবে? হয়তো আফজাল ভাই সেসময় মডেল খুঁজছিলেনও। তিথীর প্রস্তাব পেয়ে সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, আমি মডেলিং করবো। এরপর আমার ছবি নিল। ছবি নেয়ার পর একমাস তো কোনও খোঁজই ছিল না। আর আমিও আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। ভেবেই নিয়েছিলামওসবআমাকে দিয়ে হবে টবে না। হঠাৎ মাত্রা থেকে ফোন করে বলা হলো-আফজাল হোসনে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। তারপর আফজাল ভাই বললেন আমরা ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ফোনে কথা হওয়ার পর গেলাম মাত্রায়। ভিডিও শুট করা হলো। ভিডিও শুট করার পর এক-দেড় মাস আবার কোনও খোঁজ নেই। ধরেই নিলাম আমাকে দিয়ে হবে টবে না। মনে মনে ধরেই নিলাম কাজটি হচ্ছে না। একটু মন খারাপও হলো। বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ করে আফজাল ভাই ফোন দিয়ে বললেন, দেখুন আমি চাইছিলাম আপনাকে দিয়ে ভালো কোনও বিউটি প্রোডাক্টের বিঞ্জাপন করাতে। এজন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু একটি তেলের বিঞ্জাপনের জন্য যার মডেলিং করার কথা ছিল শেষ মুহুর্তে তার ফ্যামিলি রাজি হচ্ছে না। যদি আপনি রাজি হন তাহলে কাজটি করে নিতে পারবো। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। কারণ আফজাল হোসেন মিডিয়ায় একটি বিশাল ব্যাপার। তিনি আমাকে ডাকলেই চলে যেতাম এবং কাজটি করে দিতাম। তার মতো মানুষের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন ছিল না। তারপর তার কথায় আমি মুগ্ধ হলাম এবং এভাবেই প্রথম কাজটি করে ফেললাম।
ছোটবেলায় মানুষের তো নানা রকম স্বপ্ন থাকে। একেক জন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন হতে চায়। আমি ভাবিনি মডেলিং করবো, অভিনয় করবো। ভেবেছিলাম গানের শিল্পী হবো। কারণ ছোটবেলায় ওস্তাদ রেখে গান শিখেছিলাম। যদিও পরে গান আর কন্টিনিউ করিনি। শখের বশে মডেলিং করা হলেও মডেলিং এবং অভিনয় আমার নেশা এবং পেশা হয়ে গেছে।
মডেলিং করতে করতে ১৯৯৫ সালের দিকে নাটকে কাজ শুরু করি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল কম সময় নন। এর মধ্যে নাটকের কাজ করিনি। সেভাবে কেউ নাটক করতে বলেওনি। অভিনেত্রী হবো এই ভাবনাটাও কাজ করেনি। ফারিয়া হোসেন হঠাৎ একদিন আমাকে বললেন, একটি নাটক নির্মাণ করছি, তুমি কাজটি করো। এটি তোমার ক্যারিয়ারে প্লাস হবে। নাটকের নাট্যাকার ছিলেন অরুণ চৌধুরী। ক্যামেরাম্যান ছিলেন আনোয়ার হোসেন বুলু। আমার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান। ডেট ফাইনাল হওয়ার আগে ফারিয়া হোসেনের বাসায় রিহার্সেল করি। জাহিদ হাসানসহ সবাই অসম্ভব সহযোগিতা করেন। এভাবেই নাটক শুরু। নাটকটি প্রচার হয় ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। নাটকের ক্ষেত্রে 'সম্র্পক' নাটকটি করার পর আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই যে শুরু হলো সেই থেকে ওই সময়ের টপমোস্ট ডিরেক্টর যারা ছিলেন তাদের সবার কাজ আমি করেছি। তখন তো এখনকার মতো পলিটিক্স হতো না। 'সর্ম্পক' করার পর সাইদুল আনাম টুটুলের 'শেকু সেকান্দার' নাটকটি করি। ওটাও ছিল একেবারেই ব্যাতিক্রমী একটি কাজ। এখনও অপি করিম কিংবা তারিনসহ অনেকেই বলে তানিয়া আপা, তোমার সময়ের ওই নাটকগুলোর মতো কাজ আমরা পাই না। এদিক থেকে আমি নিজেরক ভাগ্যবতী মনে করি।
নাটক কিংবা বিঞ্জাপনে আমাকে নিতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি এরকম অনেক হয়েছে। যখন নাটক করা শুরু করি তখন আফজাল হোসেনের একটি বিঞ্জাপনে আমাকে সিলেক্ট করলেন। ড্রেসও বানালাম। প্রস্ততিও নেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত কোনও একটা কারণে আমাকে নেওয়া হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে স্ক্রিপ্ট হয়তো আমাকে ডিমান্ড করছে না। এজন্যই নেওয়া হয়নি। আমি মোটেও অভিমান করিনি, কষ্ট পাইনি। ভেবেছি এ রকম হতেই পারে। নাটকেও ও রকম অনেকবার হয়েছে। আমি তাদের নাম বলতে চাইনা। কিন্তু আমি সব কিছুকে পজিটিভলি নিয়েছি।
খুব বেশি স্ট্রাগল আমকে করতে হয়নি। সেটা কি নাটক, কি মডেলিংয়ে। একটা কমপ্লেন সব সময় থাকে-এই সমস্যা ওই সমস্যা উল্টাপাল্টা প্রপোজাল। এসব আমার ক্ষেত্রে হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে আমি যদি আমার পারসোনালিটি বজায় রাখতে পারি তাহলে সমস্যা হবে কেন? শুরুর সময়ে আমার কখনই মনে হয়নি জোর করে কেউ কিছু করতে পারবে। কাজেই স্ট্রাগলের কথা যদি বলতে হয়, তবে বলব, তেমন স্ট্রাগল আমাকে করতে হয়নি। কাজ পাওয়ার জন্য কারও কাছে, কারও অফিসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়নি। দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এতে আমি ভাগ্যবতী মনে করি নিজেকে। কারণ মডেলিং এবং নাটক দুটিই হঠাৎ করেই পেয়েছি। আমার মামারা আছেন কিন্তু তারা তো ফিল্মে।
'নি:শ্বাসের কাছাকাছি' নাটকও আমাকে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা দিয়েছে। দর্শকরা আমাকে চিনেছেন অভিনেত্রী হিসাবে। নি:শ্বাসের কাছাকাছিতে আমার বিপরীতে ছিলেন খালেদ খান। এরপর করি 'দক্ষিণের ঘর'। এই নাটকে ছিলেন তারিক আনাম খান, বন্যা মির্জা, খালেদ খান, জয়ন্ত চট্রোপাধ্যায়। গল্পের শেষ আছে নামে একটি নাটক করি ওই সময়ে। নাটকটির জন্য আমি ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম।
ওই সময়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় দুটি ধারাবাহিক নাটক 'ছোট ছোট ঢেউ' এবং 'না'-তে আমি কাজ করি। ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় আমাকে। বিশেষ করে 'ছোট ছোট ঢেউ' ছিল অনেক গ্ল্যামারাস প্রোডাকশন। মনে পড়ে পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। ভাঙ্গা পা নিয়ে শুটিং করেছিলাম। এসব নাটক আমাকে তারকা অভিনেত্রী হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আবার 'রঙের মানুষ' ও আমাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। ওটা করার পর দর্শকরা বুঝতে পারে আমিও কমেডি করতে পারি। হুমায়ুন আহমেদের 'গুনীন' নাটকটিও আমাকে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। 'লোভ' নামে একটি নাটক করেছিলাম। ওটাও আমাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। একটা সময়ে আমার যখন সেপারেশন হয়ে যায় তখন আমি আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসি। সে সময়ে আমি স্ট্রাগল করেছি। তারপরও যেহেতু অভিনয়ে একটা নাম হয়ে গেছে কাজেই আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কাজ করতে করতেই এগিয়ে চলেছে সময়।
তথ্যসুত্র:--আনন্দধারা
Add as favourites (155) | Quote this article on your site | Views: 1059
|