| Exclusive Interview For Shormilla Ahmed |
|
|
|
ঢাকার রামপুরা এলাকার চারতলা একটি বাড়ি।
চারপাশে খোলামেলা। গাছগাছালিও আছে বেশ ক’টি।
মহানগরীর কোলাহল বাড়িটিকে। ছুঁতে পারেনি। মেইন রোড থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে বাড়িটির
অবস্থান। তবে রাস্তার মোড়ের চা-বিক্রেতা ছেলেটির কাছেও বাড়িটি পরিচিত। সবাই জানে
এখানে একজন নামকরা অভিনেত্রী থাকেন। তার নাম শর্মিলী
আহমেদ। রামপুরা বা ঢাকা শহরের লোকজনই নয়, সারা
দেশের মানুষই তাকে চেনে। চার দশক ধরে অভিনয় করে হয়ে উঠেছেন মমতামুখী মায়ের প্রতীক।
সম্প্রতি শর্মিলী আহমেদের মুখোমুখি হয়ে আনন্দ আলো জেনে নিল তার জীবনের গল্প...
ঠিকানার পরেই আবির্ভাব...
বিপুল হাসান
সেই ষাটের দশক থেকে অভিনয়ে নিবেদিত আছেন
শর্মিলী আহমেদ। চলচ্চিত্র-টেলিভিশন-মঞ্চ-বেতার, সব মাধ্যমেই রেখেছেন। দীপ্ত
পদচারণার চিহ্ন। শিল্পী জীবনে সঞ্চয় করেছেন বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা। আনন্দ
আলো’র
সামনে নিজেকে মেলে ধরলেন তিনি। আসুন পাঠক, এই
বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর গল্প শুনি।
হাঁটি
হাঁটি পায়ে পায়ে অভিনয়
শর্মিলী আহমেদ অভিনয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা
বয়সে। বাবা তোফাজ্জল হোসেন ছিলেন রাজশাহীর সবার পরিচিত নাটকের মাস্টার। রাজশাহীর
তৎকালীন ডিসি তাকে ‘মাস্টার অব
ড্রামা’
খেতাব দিয়েছিলেন। তাদের বাড়ির ড্রয়িংরুমেই হতো নাটকের রিহার্সেল। যে বয়সে বালিকারা
এক্কা-দোক্কা বা গোল্লাছুট নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে শর্মিলী আহমেদ বাবার পাশে
বসে নাটকের মহড়া দেখতেন। বাবার হাত ধরে মঞ্চে নাটক দেখতে যেতেন। মনে মনে ভাবেতেন,
ইস আমিও যদি অভিনয় করতে পারতাম। ৪ বছর বয়েসেই
অবশ্য সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়। আবদুল জব্বার খানের লেখা ‘কোরানীর
জীবন’-এ
শিশু শিল্পীর চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর তো স্কুল লাইফেই একের পর এক অনেক
নাটকে অভিনয় করেছেন। শর্মিলী আহমেদ রাজশাহী শহরে বড় হয়ে উঠলেও তার জন্মস্থান মুর্শদাবাদে।
প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনেই তিনি পৃথিবীর আলো দেখেছিলন। শর্মিলী
আহমেদের জন্মতারিখ ৮ মে ১৯৪৭। বাবা মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। মুর্শিদাবাদেকে
পাকিস্তানের অংশ করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ কারণে দেশবিভাগের পর ভারত
সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরোধে তার বিরুদ্ধে জারি করে হুলিয়া।
ফলে তাকে পালিয়ে আসতে হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহীতে। পরে পুরো পরিবারই
রাজশাহীতে সেটেল করে। শর্মিলী আহমেদের মা আনোয়ারা খাতুন পর্দানশিন গৃহবধূ হলেও
ভালো সেতার বাজাতেন। সস্তানদের গানবাজনা আর অভিনয়ে
সবসময়ই অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। পাঁচ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে
শর্মিলী আহমেদ সবার বড়। তাই বাবা-মার আদর আর প্রশ্রয় বরাবরই একটু বেশি পেয়েছেন।
মঞ্চ থেকে রেডিও অতঃপর চলচ্চিত্র
শর্মিলী আহমেদ ম্যাট্রিক পাস করে
রাজশাহী প্রমত্থ নাথ গার্লস স্কুল থেকে। এ স্কুলের একটা ঐতিহ্য
ছিল। প্রতিবছরইএখানে নাটকের আয়োজন করা হতো। আর নাটক পরিচালনার জন্য ডাক পড়ত
তৎকালীন রাজশাহীর সবার প্রিয় নাট্যশিহ্মক শর্মিলী আহমেদের বাবা তোফাজ্জল হোসেন
মাস্টারের। পরিচালকের মেয়ে হিসেবে নয়, অভিনয়-প্রতিভার গুণেই সেসব নাটকের প্রধান
চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেতেন। মেয়েরাই সেখানে ছেলে সেজে অভিনয় করতেন।
শরৎচন্দের ‘বিন্দুর
ছেলে’
অবলম্বনে নাটকের একটি প্রধান চলচ্চিত্র অমূল্য-এর ভূমিকায় অভিনয়ের স্মৃতি আজও
শর্মিলী আহমেদের মনে আছে। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হবার পর যুক্ত হন বেতার নাটকে।
রাজশাহী বেতারের নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি
অনুষ্ঠানে ঘোষিকা হিসেবেও কাজ করেছেন কিছুদিন। কলেজে পড়াশোনার
সময় তিনি ছিলেন সিনেমার পোকা। রাজশাহীর কোনো সিনেমা হলে উওম-সুচিত্রার ছবি এলে
কখনোই মিস করতেন না। ইন্টারমিডিয়েট পরীহ্মা দেবার পর বাবার বন্ধু আবদুল জব্বার খান
ও কামাল আহমেদের মাধ্যমে হঠাৎ করেই পান
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ। সেটা ১৯৬৪ সালের কথা। তখন চলছিল উর্দু ছবির জোয়ার।
ইকবাল ফিল্মসের উর্দু ছবি ‘উজালা’-তে
অভিনয়ের জন্য তিনি ঢাকা আসেন। ছবিতে দুই নায়িকার ভূমিকায় যথাক্রমে সুতলানা জামান ও
শর্মিলী আহমেদের অভিনয়ের কথা ছিল। ঢাকায় শর্মিলী আহমেদকে তার ‘ঠিকানা’
ছবিটির নায়িকা হবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ‘উজালা’
ছবির পরিচালক আবদুল জব্বার খান চাইলেন না, শর্মিলী আহমেদ একই সাথে অন্য ছবিতে
অভিনয় করুক। তিনি যেকোনো একটি ছবি বেছে নিতে বলেন। ‘ঠিকানা’
ছবিটি নায়িকা প্রধান হওয়ায় এবং সেখানে একক নায়িকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ
থাকায় শর্মিলী আহমেদ সেখানেই অভিনয় করলেন। ছবিটি
শেষ পর্যন্ত অবশ্য রিলিজ পায়নি। এরই মাঝে তিনি লাহোরের একটি প্রযোজনা সংস্থার ছবি ‘জুগলু’-তে
অভিনয় করেন। তার বিপরীতে নায়ক ছিলেন শওকত আকবর। ভিলেন ছিলেন খলিল। ছবিটি প্রথমে
পশ্চিম পাকিস্তান ও পরে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি
উদ্দিন আহমেদ (রুপকার) পরিচালিত উর্দু ছবি ‘পানছি বাওড়া’-তে।
পরবর্তীতে এ ছবির পরিচালককে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত
সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’
ছবিটি ছিল শর্মিলী আহমেদ অভিনীত বাংলা সিনেমা। এতে তার বিপরীতে নায়ক ছিলেন আজিম।
ছবিটির আরেক জুটি ছিল রাজ্জাক-কবরী।
মাজেদা মল্লিক থেকে শর্মিলী
শর্মিলী আহমেদের আসল নাম মাজেদা মল্লিক।
চলচ্চিত্রে আসার আগে মঞ্চে ও রেডিওতে এ নামেই অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের নায়িকা
হিসেবে মাজেদা মল্লিক নামটি উপযুক্ত মনে না হওয়ায় চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের
পরামর্শে শর্মিলী নামটি তিনি বেছে নেন। পরে স্বামী চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রকৌশলী
রকিব উদ্দিন আহমেদের পদবি যুক্ত হয়ে শর্মিলী আহমেদ নামে পরিচিতি পান। ‘আবির্ভাব’
ছবিটিই তাকে দর্শকদের কাছে সুপরিচিত করে তোলে। একই সময় তিনি টিভি নাটকেও অভিনয়
শুরু করেন। প্রথম অভিনয় করেন ধারাবাহিক নাটক ‘দম্পতি-তে।
১৯৬৮ সালে প্রচার হওয়া এ নাটকে তার বিপরীতে ছিলেন সৈয়দ আহসান আলী সিডনি।
স্বাধীনতার আগে শর্মিলী আহমেদ অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আবির্ভাব,
পলাতক, আয়না ও অবশিষ্ট, আলিঙ্গন প্রভৃতি। টিভি নাটকেও
এ সময় নিয়মিত অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। এ সময় স্বামীর কর্মস্থল চট্টগ্রামের
কাপ্তাইয়ে থেকেছেন। ১৯৭৬ সালে মহসীন পরিচালিত ‘আগুন’
ছবির মাধ্যমে আবার চলচ্চিত্রে ফিরে আসেন। ছবিটিতে তার বিপরীতে ছিলেন রাজ্জাক।
রাজ্জাকের ছিল ডাবল রোল। শর্মিলী আহমেদের ছেলের ভূমিকাতেও তাকে
দেখা যায়। ছবিটির আরেক নায়িকা শাবানা তখন তাকে বলেছিলেন, এই যে আপনি চুলে রঙ
লাগিয়ে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করছেন এ থেকে বের হওয়া আপনার জন্য মুশকিল হয়ে যাবে।
শাবানার কথাই পরে সত্যি হয়েছিল। ‘আগুন’
ছবিটির পর শর্মিলী আহমেদের কাছে কেবল মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব
আসতে থাকে। এরপর একে একে অভিনয় করেন রুপালী সৈকতে, বসুন্ধারা, আরাধনা, এমিলের
গোয়েন্দা বাহিনী, ডানপিটে ছেলে, দহন, রাই বিনোদিনী, সুদ আসল, স্বর্গনরকসহ আরো
বেশিকিছু ছবিতে। চলচ্চিত্রাঙ্গনের পরিবেশ পছন্দ না হওয়ায় সিনেমায় অভিনয় থেকে আবার
নিজেকে গুটিয়ে নেন। এ সময় টিভি বেশি জোর দেন।
হালে আবারও শর্মিলী আহমেদ চলচ্চিত্রাভিনয়ে ফিরে এসেছেন, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে
চলচ্চিত্রে বইতে শুরু করেছে সুবাতাস। অভিনয় করেছেন ‘চাচ্চু’
ও ‘টিপটিপ
বৃষ্টি’
ছবিতে। আর টিভি নাটক তো আছেই। একক আর ধারাবাহিক মিলিয়ে শর্মিলী আহমেদ অভিনীত টিভি
নাটকের সংখ্যা দুইশ’র
কোঠা ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর টিভি নাটকই হয়ে উঠেছে তার জীবিকার
প্রধান অবলম্বন।
একজন
মমতামীয় মা
শর্মিলী আহমেদের স্বামী চলচ্চিত্র
পরিচালক ও প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন আহমেদের আগের
পরিবারের ছিল তিন ছেলে। শর্মিলী আহমেদের গর্ভজাত একমাত্র কন্যা সন্তান
তনিমা আহমেদ। চার সন্তানকে অবশ্য কখনোই
তিনি আলাদা চোখে দেখেননি বলে জানালেন। তিন ছেলেই এখন আমেরিকা প্রবাসী। মেয়ের বিয়ে
আর স্বামীর মূত্যুর পর অনেকটাই একাকী হয়ে পড়েন শর্মিলী আহমেদ। টিভি নাটকে
অভিনয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠার মাধ্যমেই কাটিয়ে ওঠেন নিঃসঙ্গতা। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে
যে,সপ্তাহের ৪/৫ দিনই ব্যস্ত থাকতে হয় নাটকের স্যুটিংয়ে। যখন যেখানে স্যুটিং করতে
যান ইউনিটের মানুষগুলো হয়ে ওঠে তার আপনজন। সব
জায়গাতেই তিনি সম্মান পেয়ে অভ্যস্ত। মমতাময়ী মায়ের চরিত্র
অভিনয় এত বেশি করেছে যে ইউনিটের অনেকেই তাকে মা বলে ডাকে। প্রবাসী সন্তান আর তাদের
পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। প্রতি সপ্তাহেই। ওদের সঙ্গে কথা না হলে কেমন যেন মনের
ভেতর অস্থিরতা কাজ করে। মেয়ে তনিমা আহমেদ অভিনয়ে এসেছেন মায়ের অনুপ্রেরণাতেই। তবে
অভিনয়ে তনিমা নিয়মিত ও সিরিয়াস নন। বর্তমানে উর্ধ্বতন পদে চাকরি করেছেন ইউএস
টিভিতে। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে আলাদা বাড়িতে থামলেও কিছুদিন হলো শর্মিলী আহমেদ
জোর করে তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। রামপুরার একই বাড়িতে তারা আলাদা ফ্ল্যাটে
থাকছেন। ছোট ও বড় পর্দার মমতাময়ী মা শর্মিলী
আহমেদ যে সত্যিজীবনের একজন মমতাময়ী মা তা বোঝা যায় সন্তানদের সম্পর্কে তার আবেগঘন
কথাবার্তায়।
এই সময়ের দিনযাপন
শর্মিলী আহমেদ শিল্পী জীবনের প্রথম থেকে
এ পর্যন্ত একটা নিয়ম খুব মেনে চলার চেষ্টা করেন। কখনোই তিনি নির্মাতাদের
ভোগাতে চান না। সময়মতো স্যুটিংয়ে যাওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। স্যুটিং
থাকলে সকাল সকাল বিছানা ছাড়েন। নিয়ম মেনে একটু এক্সারসাইজ করে নেন। শর্মিলী আহমেদ
চার রুমের আলাদা ফ্ল্যাটে থাকেন। সঙ্গে থাকেন দুজন কাজের লোক। বাজার সদাই
রান্নাবান্নার কাজ ওরাই করে। বেশিরভাগ দিন
স্যুটিং শেষ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। যত রাতই হোক না কেন ছোট ভাইয়ের তিন
বছর বয়সী মেয়ে রাঙতার সঙ্গে তার কিছুটা সময় কাটানো
চাই। চারতলা বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে ছোটভাই সপরিবারে থাকেন। ছোট্টমনি রাঙতা
শর্মিলী আহমেদের ভীষন ন্যাওটা। ফুফুকেই সে মা বলে
ডাকে। যেদিন স্যুটিং না থাকে ঘুমটাকে একটু বেশি প্রশ্রয় দেন। নিজের হাতে ঘর সাজান।
রান্নাঘরে ঢুঁ দেন। বাড়ির সামনের গাছপালার যত্ন নেন।
কখনো ডুব দেন বইয়ের পাতায়। সপ্তাহের ছুটির দিনটা সবসময় একটু অন্যভাবে কাটাতে পছন্দ
করেন শর্মিলী আহমেদ। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে
আসেন নিজের বাসায়। এমন শুক্রবার ভাইবোন বা আত্মীয়স্বজন তার বাসায় উপস্থিত নেই।
দিনটা কাটান ভীষন আনন্দের সঙ্গে। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোটা তার ব্যক্তিজীবনের
সবচেয়ে বড় এন্টারটেইনমেন্ট। শর্মিলী আহমেদ সবশেষে আনন্দ আলোকে জানালেন, এই বয়্যসে
এসে জীবনের কাছে তার আর কিছু চাওয়া বা পাওয়ার নেই। শিল্পী জীবনে পেয়েছেন মানুষের
ভালোবাসা আর সম্মান। পরিপূর্ণ তিনি ব্যক্তিজীবনেও। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়
করে যেতে চান। আর দেখতে চান প্রিয়জনদের মুখের হাসি। Add as favourites (29) | Quote this article on your site | Views: 108
Write Comment
|
||||||
| < Prev | Next > |
|---|





